গাইবান্ধায় ছেলের প্রেমের খেসারত দিলেন রিকশাচালক বাবা, শেষ দেখা হলো না

নিউজ ডেস্ক:
প্রেমের টানে ঘর ছেড়ে পালিয়ে যায় ছেলে-মেয়ে। এতে মেয়ের প্রভাবশালী পরিবার ক্ষিপ্ত হয়ে ছেলের রিকশাচালক বাবাকে রাতভর আটকে রেখে নির্যাতন চালায়। ঘটনার পাঁচদিন পর মেয়েকে বাড়িতে ফিরিয়ে আনা হয়। পরে সালিস বৈঠকে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানের উপস্থিতিতে ছেলের বাবা ছকু মিয়াকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করে গ্রাম ছাড়ার সিদ্ধান্ত দেন স্থানীয় মাতব্বররা। জরিমানার টাকা সংগ্রহ করতে ঢাকায় গিয়ে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা যান ছকু মিয়া। বর্তমানে মেয়ের পরিবার ও গ্রাম্য মাতব্বরদের হুমকিতে এলাকা ছাড়া ছকু মিয়ার ছেলে।

সম্প্রতি ঘটনাটি ঘটেছে গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর উপজেলার দামোদরপুর ইউনিয়নের পূর্ব দামোদরপুর গ্রামে। এ ঘটনায় এলাকাবাসীর মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে।

এলাকাবাসী জানায়, পূর্ব দামোদরপুর (পুটিমারি) গ্রামের রিকশাচালক ছকু মিয়ার ছেলে পোশাকশ্রমিক মোজাম্মেল হকের (২০) সঙ্গে কয়েক বছর আগে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে প্রতিবেশী মন্টু মিয়ার স্কুলপড়ুয়া মেয়ের। প্রেমের টানে তারা গত ১৫ মে পালিয়ে যায়। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে মন্টু ও তার পাঁচ ভাই ছকু মিয়াকে ধরে নিয়ে বাড়িতে আটকে রাতভর নির্যাতন করেন। একদিন পর জাতীয় জরুরি সেবার ৯৯৯ নম্বরে কল করে পুলিশের সহায়তায় ছকু মিয়াকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এরপর মেয়েকে অপহরণের অভিযোগে সাদুল্লাপুর থানায় লিখিত অভিযোগ দেন মন্টু মিয়া।

ঘটনার পাঁচ দিন পর গাজীপুরের মৌচাক থেকে মেয়েকে উদ্ধার করে বাড়িতে নিয়ে আসা হয়। পরে মেয়ের পরিবার সালিস বৈঠক ডাকেন। গ্রামের পেস্তা ডাক্তারের বাড়িতে স্থানীয় চেয়ারম্যান এজেডএম সাজেদুল ইসলাম স্বাধীনের উপস্থিতিতে সালিস বৈঠক হয়।

সালিসে ছকু মিয়াকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করে গ্রাম ছাড়ার রায় হয়। জরিমানার টাকা সংগ্রহে ঢাকায় গিয়ে গত ৩ জুন দুপুরে মারা যান ছকু মিয়া। লাশ বাড়িতে নিয়ে আসার পর আবার সালিস বৈঠক ডাকা হয়। বৈঠকে ৭০ হাজার টাকা ছকু মিয়ার পরিবারকে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে লাশ দাফনের সিদ্ধান্ত দেন স্থানীয় মাতব্বররা।

স্বজনদের অভিযোগ, রাতভর আটকে রেখে ছুক মিয়াকে নির্যাতন করেন মেয়ের বাবা মন্টু ও তার পাঁচ ভাই। পরে সালিসে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা এবং গ্রাম থেকে বিতাড়িত করার অপমানে মানসিক চাপে তার মৃত্যু হয়।

ছকুর ছেলে মোজাম্মেল হকের অভিযোগ, জরিমানার টাকা পরিশোধে আমাদের থাকার ঘরটি বিক্রি করে দেয় মেয়ের পরিবার। দাফনের আগে আমাদের আটকে রাখা হয়েছিলো। বাবাকে শেষ দেখা ও কবরে মাটি দিতে দেয়নি। মেয়ের পরিবারের হুমকিতে একমাত্র বোনকে নিয়ে আমি পালিয়ে বেড়াচ্ছি। তাদের বিরুদ্ধে মামলা করার কথা ভাবছি। কিন্তু ভয়ে মামলা করতে পারছি না।

এদিকে, ছেলের প্রেমের খেসারতে বাবার মৃত্যু ও পরিবারকে গ্রাম ছাড়া করার ঘটনায় নানা প্রশ্ন ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে এলাকাবাসীর মধ্যে। তারা বলছেন, প্রভাবশালী ওই পরিবারের সাত ভাইয়ের ছয়জনই দাদন ব্যবসায়ী। তাদের প্রভাব আর নির্যাতনের শিকার হয়েছেন গ্রামের অনেকেই। বর্তমানে সালিসদারদের সহায়তায় ছুক মিয়ার মৃত্যুর বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছেন তারা। তাদের বিচার চেয়েছেন এলাকাবাসী।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চেষ্টা করেও বক্তব্য পাওয়া যায়নি সালিস বৈঠকে থাকা বাড়ির মালিক পেস্তা ডাক্তারসহ গ্রাম্য মাতব্বরদের।

সালিসে উপস্থিত থাকা দামোদরপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সাজেদুল ইসলাম স্বাধীনকে পাওয়া যায়নি ইউনিয়ন পরিষদে গিয়েও। তবে মোবাইলে তিনি জানিয়েছেন, উভয় পরিবারের সম্মতিতে ঘটনাটি সমাধানের চেষ্টা করেছেন তিনি। এ নিয়ে আর কিছুই বলতে চান না তিনি।

এদিকে অভিযুক্ত প্রভাবশালী পরিবারের বাড়িতে গিয়ে দেখা হয় মন্টু মিয়ার বড় ভাই আলমগীর হোসেনের সঙ্গে। জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ বিষয়ে আমাদের কিছুই বলার নেই।

তবে খবর নিয়ে জানা গেছে ঘটনাটি জানা আছে স্থানীয় প্রশাসন-পুলিশের। বিষয়টি খতিয়ে দেখার কথা জানিয়েছেন সাদুল্লাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. নবীনেওয়াজ।

পাশাপাশি লিখিত অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানালেন সাদুল্লাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি-তদন্ত) মো. মোস্তাফিজুর রহমান।

-বাংলাট্রিবিউন।

Comments (0)
Add Comment