EID2

ব্লেইম গেইমের শিকার হয় পুলিশ!

ইফতেখায়রুল ইসলাম

(লেখাটা একটু বড় তবে পড়লে আমাদের সকলের চরিত্র বুঝা যাবে… হ্যাপি রিডিং 😁)

গতকাল রাতে ভদ্রলোক সরকারি নাম্বারে ফোন করেই বললেন আপনি কি অমুক বলছেন, আমি বললাম জ্বি বলছি! খুব উত্তেজিত হয়েই বলছেন, দেখেন আপনাদের পুলিশ আমার সাথে কি করেছেন, অন্যায়ভাবে আমার নামে মামলা নিয়েছে! কী মামলা জিজ্ঞেস করতেই তিনি বললেন ধর্ষণের মামলা! আমি বিস্মিত হলাম।

পরমুহূর্তেই জিজ্ঞেস করলাম কে মামলা করেছে? তখন বললো আমার আপন বোন মামলা করেছে আর ভিকটিম আমার নিজের ভাগ্নী! মামলায় ভিকটিম একজন শিশু! নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে একটি মামলা করা হয়েছে, যে মামলার বাদী অভিযুক্তের আপন বোন আর ভিকটিম নিজের ভাগ্নী! এর চাইতে আরও বড় জঘন্য অপরাধের নজির আছে হাজারে হাজারে। বাদী বোন, অপরাধী ভাই আর ভিকটিম কিশোরী ভাগ্নী! ব্লেইম গেইমের শিকার কে? সৎ মায়ের অপ্রিয় সন্তান পুলিশ! কি বিচিত্র না?

মামলা না নিলে বলা হবে ধর্ষিতার মামলা নেয়নি পুলিশ আর নিলে বলা হবে মিথ্যা মামলা নিলো পুলিশ! অনেক বিষয় বুঝে সিদ্ধান্ত নেয়া গেলেও কিছু স্পর্শকাতর বিষয়ের ক্ষেত্রে সেই সময় ও সুযোগ কোনোটাই থাকে না!

হ্যা এরকম মিথ্যে মামলার নজিরও কম নেই। এখন সত্যি বের করতে হয় একটি তদন্ত প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে, এটাই বাস্তবতা! মিথ্যা মামলা করলে দন্ডবিধি’র ২১১ ধারা মোতাবেক মিথ্যা মামলকারীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার আবেদন জানিয়ে রিপোর্ট বিজ্ঞ আদালতে প্রেরণও করা হয়। তারপর বিজ্ঞ আদালতই ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। সম্প্রতি মিথ্যা মামলা করার অভিযোগে কয়েকজনকে শাস্তিও প্রদান করা হয়েছে। এরকম মিথ্যা মামলার বাদীদের শাস্তি প্রাপ্তির বিষয়গুলো বেশি বেশি সামনে আসলে, মিথ্যা অভিযোগকারীদের এই প্রবণতা কমবে বলে বিশ্বাস করি!

জামিন যোগ্য অপরাধের অপরাধী বিজ্ঞ আদালত থেকে জামিন পেয়ে বের হয়ে আসলে আইনী বিষয়ে অচেতন বাদী বলেন, টাকা খেয়ে পুলিশ আসামী ছেড়ে দিয়েছে 😁! হাস্যকর শোনালেও সত্যি উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত ব্যক্তিও একই কথা বলেন। কারণ আইন জানেন না! না জানতেই পারেন দরকার না হলে জানবেন কেন? শেখানোর শুরুটা অতীব জরুরি! সেটা নিশ্চয়ই পুলিশ শেখাবে না। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় আইনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সকলের জন্য আবশ্যিক করে দেয়া এখন সময়ের দাবী। এতে সকলেরই সুবিধা নিশ্চিত হবে।

জায়গা সম্পত্তি, আর্থিক লেনদেন, প্লট ও ফ্ল্যাটের সমস্যা এর সবকিছুই দেওয়ানী আদালতের বিষয়! মানুষজন এ সংক্রান্তে সাহায্য চাইলে পুলিশ অপারগতা প্রকাশ করলে অথবা বিজ্ঞ আদালতে যেয়ে মামলা দায়ের করতে বললে ভুক্তভোগী বলে বসেন পুলিশের কাছে বিচার চেয়ে পেলাম না! আরে ভাই বিচারের দায় ও দায়িত্ব কি আমার? আইনে এ বিষয়ে স্পষ্টতই বলা আছে তথাপি ব্লেইম গেইমের শিকার হয় পুলিশ! এক্ষেত্রে কখনো সামাজিক পুলিশিংয়ের অংশ হিসেবে জিডি’র প্রেক্ষিতে আমরা দুই পক্ষকে ডেকে সমস্যা শুনার চেষ্টা করি। পারস্পরিক সমঝোতা করে দেয়ার এই চেষ্টা কখনো সফল হয়, কখনো বিফল হয়! এখানে সমঝোতা না এলে আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার পরামর্শ দেয়া ছাড়া আর কোনো বিকল্প থাকে না।

হাজারে হাজারে মামলা হয় প্রতিনিয়ত। তদন্ত প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত জানালেও বাদী নয়তো বিবাদী পুলিশের উপর নাখোশ হন! একটা বিশাল অংশ এই আইনী প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই পুলিশের উপর বীতশ্রদ্ধ থাকেন সবসময়।

চোর, ডাকাত, ধর্ষকসহ বিভিন্ন অপরাধের সাথে জড়িত অপরাধীর নিজের ও তাদের পরিবারের কাছেও পুলিশ অতীব খারাপ। দুষ্টু পুলিশ কেন অযথা গ্রেফতার করতে আসে! পেশাগত ও অবস্থানগত কারণে এত ঋনাত্মক প্রভাবের মাঝে পুলিশের গ্রহণযোগ্যতা ধনাত্মক হবে এটি একটি ইউটোপিয়ান প্রত্যাশা!

নিয়ম না মানতে মানতে এদেশের একটি বিশাল অংশ মনেই করেন, নিয়ম মানাটাই ভুল। তারা নিজের ভুল তথা অপরাধকে ডিফেন্ড করেন আরেকটি অপরাধ দিয়ে। ধরেন কারো একজনের গাড়ি আটকালে তিনি বলতে থাকেন, ওই যে আরেকজন যে নিয়ম মানছেন না তাকে ধরেন না কেন? একজন, দুইজন অফিসার একসাথে যে কয়েকজনকে ধরতে পারবে না এটাই স্বাভাবিক! তাদের এই মজার ক্ষোভ আসলে অন্য জায়গায়, নিয়ম তো প্রায়ই ভাঙেন, আগে ধৃত হন নাই তো এখন হবেন কেন!?

নিয়ম ভাঙলে কোনো সমস্যা নেই এই বিশ্বাস ধরে রাখতে চাওয়া মানুষজন অন্যের উপর আইনের প্রয়োগ হওয়া পর্যন্ত আইনকে পছন্দ করেন, নিজের কাঁধে বর্তালে আইন বেজায় খারাপ, আইনের মানুষ দ্বিগুণ খারাপ। তারা ভুলেই যান উন্নত বিশ্বের মত আমাদের দেশে গাড়ির স্পিড লিমিট থেকে ধরে বিভিন্ন আইন ভঙ্গের বিষয়গুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে কোনো যন্ত্রের কাজ নয়, অফিসারকে নিজে করতে হয়। সেরকম থাকলে না হয় আপনাদের আর ধরাধরির বিষয় আসতো না, বাড়িতেই জরিমানার অর্থ পৌঁছে যেতো। এই আমাদের দেশে সিগন্যাল সাইন ও লাইট থাকা সত্ত্বেও ট্রাফিক পুলিশকে হাতের ইশারা দিয়ে, রাস্তার মাঝে দাঁড়িয়ে গাড়ি থামাতে হয়। পিক আওয়ারে মাত্র ২০ মিনিটের জন্য সরিয়ে দিন ট্রাফিক পুলিশ, নিজেদের চরিত্র নিজের চোখেই দেখতে পাবেন।

এই উপরোক্ত মানুষজনের কাছে পুলিশ শত চেষ্টা করলেও বন্ধু হতে পারবে না, এটা সম্ভবও নয়! তাঁরা আপনার কাছ থেকে মানবিকতা ও বন্ধুত্বসুলভ আচরণ প্রত্যাশা করলেও, নিজেরা সেই পথ ভুলেও মাড়াবেন না! কারণ দেশের আইন ইতোমধ্যেই আইনের মাধ্যমেই এই আইন ভঙ্গকারী মানুষজনের সাথে পুলিশের দূরত্ব সৃষ্টি করে দিয়েছে এবং সেটি দোষের নয়! ওয়ান সাইডেড বন্ধুতার চেয়ে পেশাদারী আচরণের চূড়ান্ত প্রকাশই শ্রেয়তর বলে মনে করি।

সম্মানিত নাগরিকগণ যারা আইন মেনে চলেন, আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল তাঁদের সাথেই বন্ধুতা ও পেশাদারিত্বের মেলবন্ধন হোক! কারণ বলা যায় না, সকলের বন্ধু হয়ে গেলে চোর, ডাকাতসহ সকল অপরাধী আবার না বন্ধুত্বের দাবী নিয়ে চলে আসেন!

ক্ষমতার প্রদর্শনকারীরা তো আরো কয়েক ডিগ্রি উপরে। গুলশানে নিজের গর্ভধারিণী স্ত্রীকে নিয়ে ফিরছি পথেই সম্পূর্ণ উল্টো রাস্তা দিয়ে একটি গাড়ি রীতিমতো ছুটে এসে আমাদের গাড়িকে জোরালোভাবে ধাক্কা দেয়। ভয়ার্ত চোখে নিজের স্ত্রীর দিকে তাকাই। তাঁকে একটু স্থির করে গাড়ি থেকে নেমে বিশেষ ব্যক্তিদের জিজ্ঞেস করতেই নানা যুক্তির দোহাই দিচ্ছিলেন আমি তাৎক্ষণিক পুলিশকে জানাতেই ভদ্রলোক বলে বসলেন, আপনাকে চাইলেই দেখে নিতে পারি। এত বিশাল ক্ষমতার অধিকারী একজনের ক্ষমতা দেখার আমারও ভীষণ ইচ্ছে হলো। অবস্থা বেগতিক দেখে পরমুহূর্তে ভদ্রলোক কি মনে করে আমার সহধর্মিণীকে ভাবী বলে দুঃখপ্রকাশ করলেন! গাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া সত্ত্বেও কোনো ক্ষতিপূরণ গ্রহণ ছাড়াই বিদায় দিলাম তাঁদের। সম্পূর্ণ উল্টো রাস্তা দিয়ে গাড়ি দিয়ে আমাকে ক্ষতিগ্রস্ত করার পর আবার আমাকেই দেখে নেবার মানসিকতা! ‘ইয়েস দ্যাট ইজ হাও উই আর’!

লিখতে ইচ্ছে করেনা যদিও, তাও লিখি। আপনাদের অনেকের ভুলে যাওয়া চরিত্র মনে করিয়ে দিতে লিখে যাই। আপনাদের, আমাদের স্মৃতিশক্তি আবার গোল্ড ফিশের মত কিনা, তাই স্মরণ করিয়ে দিতে আসি বারবার, আপনারা আবার কিছু মনে করেন না যেন!

ক্ষমতার কথা যে বলছিলাম এর আবার রকমফের রয়েছে আর এই বিভিন্ন ধরণের ক্ষমতার বাতাবরণে আবৃত মানুষ ক্ষমতার প্রদর্শন করেই ফেলেন কোনো না কোনোভাবে! সেক্ষেত্রে আইন ভঙ্গ হলো কিনা সেটি তাদের কনসার্ন নয়! তিনি এক্ষেত্রে নিয়মের ধার ধারতে চান না। বৈধ আইনী দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আমি কার ছেলে, আমি কার অমুক, আমি কার তমুক এসব শুনে আমাদের অফিসারদের ঠান্ডা থাকার চেষ্টা করতে হয়। চাকরিটাই এমন। কখনো গুটিকয়েক হয়তো মানসিক স্থিরতা হারিয়ে ফেলেন, দিনশেষে নিয়ম ভাঙার এই শহরে স্থিরতা ধরে রাখা যে এক বিশাল সংগ্রাম সেটি আরাম কেদারায় বসে কজনই বা বুঝবেন!

না একদমই বলছি না কারো বিচ্যুতি নেই। আমাদের পুলিশ সদস্যদের বিচ্যুতির প্রেক্ষিতে তাদের বিরুদ্ধে গৃহীত অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থা যতটা নেয়া হয় তার দৃষ্টান্ত আশেপাশে খুব কমই দৃশ্যমান।

লঘু পাপ হলে আপনার মত এই সদস্যের চাকরি থাকা উচিত না বলে ফেলা লোকজনের জ্ঞাতার্থে জানাই, এখানেও বিধিবদ্ধ নিয়ম রয়েছে, চাইলেই কাউকে জোরপূর্বক আপনার অযাচিত চাওয়ার মত চাকরি থেকে বহিস্কার করা যায় না! তারপরও ডিমোশন, অর্থ কর্তন, পদচুত্যিসহ বিভিন্ন ব্যবস্থা প্রতিনিয়ত নেয়া হয়, হচ্ছে! অভ্যন্তরীণ বিষয় বিধায় অজানা থেকে যায় এসব বিষয়। আইন আর বিধি যাই-ই বলেন সেখানে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ থাকবেই, ফৌজদারী অপরাধে জড়িয়ে পড়া অপরাধীও সেই সুযোগ পান। অবশ্য আপনাদের দোষ দিয়েও লাভ নাই, যতটুকু আইনের বেসিকস জানা দরকার সেটিই যখন জানা থাকে না তখন প্রতিষ্ঠান কিভাবে অভ্যন্তরীণ শাস্তি নিশ্চিত করে সেটি কস্মিনকালেও জানা থাকার কথা না। হাতে মোবাইল আর ইন্টারনেট থাকলে এখন সকলেই আইনবিশারদ হয়ে যান, আইন না জানা থাকলেও 😁

খেয়াল করে দেখেন, পুলিশের কোনো সদস্য অপরাধ করলে তার সাফাই পুলিশ কখনোই গায় না, পুলিশ শুধু ব্যক্তির দায়কে প্রতিষ্ঠানের উপর চাপিয়ে দিতে নিরুৎসাহিত করে। সারপ্রাইজিংলি তখন নিয়ম ভাঙা দলের সদস্যরা এটি সমগ্র পুলিশের দায় হিসেবেই বিবেচনা করতে চান। অন্যদিকে পুলিশের ভাল কোনো কাজ হলে সেটিকে আবার সেই নিয়ম ভাঙা গ্রুপের সদস্যগণ শুধু ব্যক্তির অর্জন বলেই মানতে চান, প্রতিষ্ঠানকে মোটেও ক্রেডিট দিতে চান না ! কি সুন্দর তাই না? এরুপ বিচিত্র জাজমেন্ট, কেউ আমাদের দেশে এসে আমাদের কাছ থেকে শিখে যাক!

যদি বলি বুকে হাত দিয়ে বলুন তো, আপনি ভাল মানুষ কিনা? যদি বলি নিজেকে জিজ্ঞেস করুন আপনি প্রতিনিয়ত ছোট, বড় আইন ভাঙেন কিনা! খুব অল্প সংখ্যক মানুষই বুকে হাত দিয়ে নিজের সুদৃঢ় অবস্থানের জানান দিতে পারবেন! এখন হয়তো বলে বসবেন, উন্নত বিশ্বের মত আপনাদেরও কেন আমরা জোর করে নিয়ম মানাই না! সমস্যা এখানেই, উন্নত বিশ্বের মত হতে চাইলে বিভিন্ন প্রভাবকের উপস্থিতি সঠিক হতে হয় তবেই সামগ্রিক চিত্র বদলায়! উন্নত পুলিশ পেতে চাইলে আপনাকে উন্নত নাগরিকের মত আচরণ করা শিখতেই হবে। আর জানেন তো আইন দিয়ে সবকিছুর বাস্তবায়ন কখনোই সম্ভব নয়, যেমনটি আমাদের সম্মানিত আইজিপি ড. বেনজীর আহমেদ বিপিএম( বার) স্যার বলেন, আইন প্রণীত হলে আমরা ধরেই নেই ৯০ ভাগ মানুষ সেটি মানবেন, যারা মানবেন না তাদের জন্যই আমরা সেটি এনফোর্স করতে চাই! আমাদের দেশে তাকালেই আমরা দেখতে পাই, আইনের প্রতি আমরা কত সংবেদনশীল ও শ্রদ্ধাশীল! এনফোর্সের চেয়ে আমরা

স্বতঃস্ফূর্তভাবে আইন মান্য করার প্রবণতার উপর জোর দিতে চাইলেও আমাদের অনেকের চাওয়া ঠিক উল্টোটাই!

জানিনা জীবদ্দশায় সত্যিকার অর্থে ‘কথায় ও কাজে এক’ মানুষের উপস্থিতি অধিক সংখ্যক হারে এ দেশ দেখতে পাবে কিনা? যতদিন বেঁচে থাকি, পুলিশ বাদে বাকি সব ভাল মানুষের দেশে আমি সেই সুদিনের অপেক্ষায় থাকবো!

লেখক : ডিএমপির এডিসি (মিডিয়া অ্যান্ড পিআর)

(ফেসবুক থেকে সংগৃহীত)

Leave A Reply

Your email address will not be published.